নিজস্ব প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯:০৪, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ২০:৪৯, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: ডেইলি দর্পণ
প্রখ্যাত ওলীয়ে কামেল, আধ্যাত্মিক সাধক, মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা ও মাইজভাণ্ডারী তরিকার ভিত্তিপ্রস্ত্র স্থাপনকারী গাউছুল আজম হযরত শাহসুফি মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ (ক.) মাইজভাণ্ডারীর ১২০তম বার্ষিক ওরশ শরিফ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) লাখো ভক্ত-আশেকানের ‘আমিন আমিন’ ধ্বনিতে আখেরি মুনাজাতের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফে ওরশ শরিফের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
শত বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর এই মহান অলির ওফাত দিবস উপলক্ষে ১০ মাঘ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমার, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত লক্ষ লক্ষ ভক্ত-অনুরক্ত ও আশেকানের সমাগমে মহাসমারোহে ওরশ শরিফ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
ওরশ শরিফের কর্মসূচির মধ্যে ছিল- শুক্রবার বাদে ফজরের পর রওজা শরিফে গোসল, গিলাফ চাদর অর্পণ, পুষ্পমাল্য প্রদান, খতমে কোরআন, খতমে গাউসিয়া, মিলাদ মাহফিল, জিকির-আজকার, ভক্তদের জন্য ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্প, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, যৌতুক ও মাদকের বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি। বিকেলে হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর জীবন ও দর্শনের ওপর আলোচনা, মিলাদ কিয়াম, ছেমা মাহফিল, তবারুক বিতরণ এবং ভোর রাতে আখেরি মুনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
ওরশ শরিফ উপলক্ষে আয়োজিত ওয়াজ মাহফিলে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ গাউছিয়া রহমানিয়া মইনীয়া মঞ্জিলের বর্তমান গদীনশীন পীর ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) চেয়ারম্যান হযরত শাহসুফি ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল হাসানী ওয়াল হোসাইনী মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘উনিশ শতকে হযরত গাউছুল আজম শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) ‘তরিকা-এ-মাইজভাণ্ডারীয়া’ প্রবর্তন করেন, যা বাংলার ভূখণ্ডে প্রবর্তিত একমাত্র তরিকা। আজ এই তরিকা বিশ্বজুড়ে একটি সমাদৃত তরিকায় পরিণত হয়েছে, যার কোটি কোটি অনুসারী রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মানবপ্রেম, সাম্য, মানবতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈষম্যহীনতা এই তরিকারের মূল আদর্শ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে গ্রহণ করার শিক্ষা দেয় মাইজভাণ্ডারী দর্শন। মানব অন্তরে স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা জাগ্রত করাই এ তরিকারের লক্ষ্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর প্রকৃত আদর্শ অনুসরণে সুফিবাদের মূলধারা এই দরবার শরিফের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে প্রচারিত হচ্ছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের প্রতিটি সংগ্রামে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে ও জুলুমের বিরুদ্ধে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।’
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আজ বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ-সংঘাত, ধর্মবিদ্বেষ, বর্ণবৈষম্য, ইসলামোফোবিয়া এবং দুর্বলের ওপর সবলের নির্যাতন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই অশান্ত পরিস্থিতিতে হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর (ক.) মহৎ আদর্শ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভাতৃত্ববোধ ও সমতার শিক্ষা দিয়ে আসছে মাইজভাণ্ডার শরিফ।’
দেশের চলমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা, আউলিয়ায়ে কেরামের মাজার, খানকাহ ও দরগায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ সমাজের শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অর্থনৈতিক সংকট ও নৈতিক অবক্ষয় দেশের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুবসমাজ ক্রমশ নৈতিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও মব জাস্টিস মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলেছে। এমনকি বিচারালয়েও মানুষ নিরাপদ নয়। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সুফিবাদের আলোকে নৈতিক চরিত্র গঠন।’
ওরশ শরিফ উপলক্ষে ফটিকছড়ি উপজেলা প্রশাসন ও ফটিকছড়ি থানা পুলিশ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।
ওরশ মাহফিলে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- শাহজাদা আলহাজ্ব সৈয়দ মেহবুব-এ-মইনুদ্দীন আল হাসানী, শাহজাদা আলহাজ্ব সৈয়দ মাশুক-এ-মইনুদ্দীন আল হাসানী, মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্টের মহাসচিব অ্যাডভোকেট কাজী মহসিন চৌধুরী, আনজুমান-এ রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়া কেন্দ্রীয় মহাসচিব খলিফা আলহাজ্ব আলমগীর খান মাইজভাণ্ডারী, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ আলম অভি, দপ্তর সম্পাদক মো. ইব্রাহিম মিয়া মাইজভাণ্ডারী, প্রচার সম্পাদক চৌধুরী মো. হোসেনসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
মাহফিলে হযরত বাবাভাণ্ডারী (ক.)-এর জীবন, কর্ম ও দর্শনের ওপর আলোচনায় অংশ নেন সংশ্লিষ্ট আলেম ও নেতৃবৃন্দ।
সালাত ও সালাম শেষে দেশ-বিদেশের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মুক্তি এবং দেশ ও বিশ্ববাসীর শান্তি কামনায় আখেরি মুনাজাত পরিচালনা করেন শাহসুফি মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল হাসানী (মা.জি.আ.)।