বাকৃবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২:৫৩, ১৯ মার্চ ২০২৬
ছবি: ডেইলি দর্পণ
ঈদ মানে আনন্দ, আর সেই আনন্দ ভাগাভাগি করতে সামান্য ছুটিটেও ছুটে চলা আপনার নীড়ে। যাত্রাপথের জ্যামসহ নানা উপেক্ষা পেরিয়ে এই চলা, এই ফেরায় থাকে অন্যরকম এক আনন্দ। শ্রমিক থেকে চাকরিজীবী- সকলেই ছুটে চলে বাড়ির খোঁজে, নাড়ীর খোঁজে। তেমনি ক্যাম্পাসের রোবটিক জীবন ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ঈদের ছুটি ও আনন্দের অনুভূতি কাটাতে ছুটে যান দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী অন্যতম।
ঈদ আনন্দ পরিবারের সঙ্গে কেমন, সেই অনুভূতি নিয়েই কথা বলেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের অনুভূতিই আজ তুলে ধরা হলো এই প্রতিবেদনে।
এক মাসের সিয়াম সাধনার পর আসে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত- ঈদুল ফিতর। এই দিনটি শুধু আনন্দ আর উৎসবের নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং মানবিকতার এক অপূর্ব প্রতিফলন। রমজানের পুরো মাস জুড়ে যে আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য এবং ত্যাগের শিক্ষা আমরা গ্রহণ করি, ঈদ সেই শিক্ষারই বহিঃপ্রকাশ।
সময়ের সাথে সাথে ঈদের অনুভূতিতেও এসেছে পরিবর্তন। ছোটবেলার ঈদ ছিল একেবারেই নির্ভার- নতুন জামা, সালামি এবং সারাদিনের নিরুদ্বেগ আনন্দে ভরা। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে, অনেক আপন মানুষকে হারিয়ে ঈদের দিনগুলো একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। তবুও ঈদের সৌন্দর্য হারায়নি; বরং পেয়েছে নতুন এক গভীরতা।
চাঁদ রাত থেকেই শুরু হয় ঈদের আবহ। আম্মুর সঙ্গে বাহারি পিঠা বানানো, হাতভর্তি মেহেদী দিয়ে রাত জেগে গল্প করা- এসব ছোট ছোট মুহূর্তে লুকিয়ে থাকে ঈদের প্রকৃত আনন্দ। সিনিয়রদের কাছ থেকে বিকাশে সালামি পাওয়া কিংবা পরিচিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানানো- সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক উষ্ণ অনুভূতি।
এবং পুরো সময়টায় ঘরে বা আশেপাশে বাজতে থাকে সেই চিরচেনা গান- ‘রমজানের এই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ গানটি যেন শুধু একটি সুর নয়, বরং পুরো রমজানের স্মৃতি ও ঈদের আনন্দকে একসাথে বেঁধে দেয়। দূর থেকে ভেসে আসা সেই সুরেই ধরা পড়ে ঈদের আসল আমেজ।
ঈদের সকালে নতুন পোশাকে সবার সঙ্গে সালাম বিনিময়, সালামি নেওয়া, এবং পরিবারের সঙ্গে ঈদের সকালের নানা আয়োজন- সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে বিশেষ। এরপর আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করা, কুশল বিনিময়, আর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বাইরে বের হওয়া- দিনজুড়ে চলে হাসি, আড্ডা আর স্মৃতি তৈরি করার পালা।
সবশেষে বলা যায়, ঈদ এখন আর শুধুই উচ্ছ্বাসের দিন নয়; এটি হয়ে উঠেছে স্মৃতি, দায়িত্ব, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার এক অনন্য মিশ্র অনুভূতি। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হলেও ঈদের আসল সৌন্দর্য অটুট। মনের গভীরে, প্রিয় মানুষদের উপস্থিতিতে, অনুপস্থিতিতে এবং প্রতিটি ছোট ছোট মুহূর্তে বেঁচে আছে।
এই ঈদ হোক প্রতিটি মানুষের জন্য শান্তি, আনন্দ ও অন্তরের সুখে ভরা।
মোছা. তাহমিনা আক্তার ইমা
পশুপালন অনুষদ
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাসে কাটানো ব্যস্ত দিনগুলোর মাঝে ঈদের ছুটি যেন একটুখানি প্রশান্তির নিঃশ্বাস। যেহেতু বাড়ি সুদূর উত্তরের জেলায়, তাই ছুটির ৭–১০ দিন আগেই টিকেট কেটে ফেলতে হয়। টিকেট কাটার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় ঈদের আমেজ। মনে মনে গুছিয়ে নেওয়া, পরিকল্পনা করা আর দিন গোনা- কখন ফিরব সেই আপন ঠিকনায়।
হলের রুম, ক্লাস, প্রাক্টিকাল, সিটি আর অ্যাসাইনমেন্টের চাপ থেকে বের হয়ে বাড়ির পথে যাত্রা করি, তখন মনটা অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে ওঠে। ক্যাম্পাসে থাকাকালীন বিভিন্ন গ্রুপ ইফতারও ঈদের আগমনী আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
পরিবারের সঙ্গে বসে ঈদের নামাজ, মায়ের হাতের রান্না, বাবার কাছে ছোট ছোট আবদার; ছোটবেলার সেই সহজ-সরল আনন্দ সবকিছুই যেন নতুন করে অনুভব করি। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার কবুলিয়াতের আনন্দে পবিত্র ঈদ সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল হাসি, শান্তি, ভালোবাসা এবং অফুরন্ত খুশি।
আনজুমান আরা রিমি
পশুপালন অনুষদ
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
আরবি মূল শব্দ 'ঈদ' মানে প্রত্যাবর্তন, অর্থাৎ যা বারবার ফিরে আসে। ফিরে আসে প্রতিবছর অনাবিল আনন্দ, উচ্ছ্বাস এবং খুশির বার্তা নিয়ে। মানুষের মাঝে জাগিয়ে তোলে ভ্রাতৃত্ববোধ, সম্প্রীতি ও সহানুভূতি।
ঈদ মুসলমানদের একমাত্র ধর্মীয় উৎসব হওয়ায় এই দিনটিকে ঘিরেই থাকে শত পরিকল্পনা। রমজানের প্রথম থেকেই ইবাদতের পাশাপাশি চলতে থাকে পূর্ণাঙ্গ ঈদের প্রস্তুতি। আনন্দ আরো বেড়ে যায় যখন বাড়ি থেকে দূরে থাকা মানুষগুলো শিকড়ের টানে নিজের নীড়ে ফেরে, ঈদের খুশি প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করবে বলে।
সবার ঘরে ঘরে দেখা যায় ঈদ উপলক্ষে কেনা নতুন পোশাক এবং হরেকধরনের খাবারের বাহারি আয়োজন। ঈদ সালামি, আত্মীয়দের বাড়ি দাওয়াত- এসব ঈদ আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ করে। তাইতো আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা- সারাবছর মুখিয়ে থাকে ঈদের জন্য।
মোছা. সুমাইয়া খাতুন
কৃষি অনুষদ
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
ঈদ আমার কাছে এক মায়াভরা অনুভূতি, যেখানে ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে হঠাৎ থেমে গিয়ে নিজের মানুষগুলোর কাছে ফিরে আসা যায়। একজন মেয়ে হিসেবে ঈদের ছুটিতে বাসায় ফেরার মধ্যে আলাদা আবেগ থাকে। মায়ের কোলে ফেরা, পরিচিত গন্ধে ভরা ঘর, আর ছোট ছোট আনন্দে ভরা সময়।
ঈদের দিন ভোরে উঠেই নিজের মতো করে প্রস্তুত হওয়া। নতুন জামা, হালকা সাজ- সবকিছুতেই যেন একটা মায়া লেগে থাকে। বাসার সবাই যখন নামাজে যায়, আমি তখন ঘরটাকে একটু গুছিয়ে রাখি, আর নিজের মতো করে সেই সকালের শান্তিটা উপভোগ করি।
এরপর শুরু হয় মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ- সেমাই, পোলাও, কোরমা। এগুলো শুধু খাবার নয়, ভালোবাসার একেকটি রূপ। দিনভর আত্মীয়দের সাথে দেখা করা, বন্ধুদের সাথে গল্প করা, আর ছোটদের ঈদি দেওয়ার মাঝে নিজের ভেতরেও এক ধরনের প্রশান্তি কাজ করে।
দিন শেষে মনে হয়, ঈদ আসলে সেই সময়টা যখন ভালোবাসা, স্মৃতি আর আপন মানুষদের মাঝে নিজেকে সবচেয়ে বেশি আপন লাগে।
মাহ্জুবা জাহান
কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বয়সের সাথে সাথে ঈদ ও রোযার আমেজ পরিবর্তন হয়েছে। কয়েক বছর ধরে রোযা মা-বাবার সঙ্গে করার সুযোগ হয় না। দূরে থাকলে মায়ের হাতের ইফতারি, বাবার মোনাজাত আর ভাইদের সঙ্গে শরবত বানানো খুব মিস করি।
বাসায় এসে মায়ের সঙ্গে বসে কাজ করা এবং বাবার সঙ্গে গল্প করার যে আনন্দ, তা অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। এই কয়েকটা দিন ভাইদের আবদারের সব খাবার রান্নার আনন্দটা অন্যরকম। আগে যাদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হতো, সেইসব বন্ধুদের সঙ্গে ঈদে বিশেষভাবে দেখা হয়। তাই ঈদ আমার জন্য ভীষণ আনন্দের। সকলকে ঈদ মোবারক।
তাসিন জামান মিম
মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়