ঢাকা, সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

৬ মাঘ ১৪৩২

খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২:০৯, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

খালেদা জিয়া-বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও অনন্য নাম। যিনি ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে রাজনীতির মঞ্চে পা রেখেছিলেন ইতিহাসের এক গভীর সংকটকালে। এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে তিনি রূপান্তরিত হন গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রীতে। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে লেখা আছে সংগ্রাম, দৃঢ়তা ও অটল দেশপ্রেমের কাব্য।

স্বাধীনতার ঘোষক ও রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতের পর, গভীর শোক নিয়েই তিনি রাজনীতির রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। সে সময় কেউ কল্পনাও করেনি—এই নির্বাক শোক একদিন পরিণত হবে পুরো জাতির কণ্ঠস্বরে।

রাজনীতির মঞ্চে আগমন

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শহীদ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এতে নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সেই শূন্যতার প্রেক্ষাপটে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন।

মাত্র আড়াই মাস পর, ২৪ মার্চ এরশাদ সামরিক আইন জারি করলে তিনি ঘরের নিরাপদ পরিসর ত্যাগ করে রাজপথে নামেন। শোকের কালো চাদর গায়ে জড়িয়ে তিনি হয়ে ওঠেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক।

১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বিএনপির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ নয় বছরের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হলো স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন। ১৯৮৩ সালে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় সাতদলীয় জোট। কোনো প্রলোভন, ভয় কিংবা আপস তাঁকে আন্দোলনের পথ থেকে সরাতে পারেনি।

এই আপোষহীনতার মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে বারবার গ্রেপ্তার, দীর্ঘ গৃহবন্দিত্ব ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৭ সালে তিনবার কারাবরণ করেন তিনি। ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবনে বছরের পর বছর কার্যত গৃহবন্দী থাকলেও তাঁর সংগ্রামী চেতনা কখনো নিভে যায়নি।

১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি স্বৈরাচার এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেন। ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগ বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা এক দিন—যার পেছনে খালেদা জিয়ার আপোষহীন নেতৃত্ব ছিল অনিবার্য।

রাষ্ট্র পরিচালনায় খালেদা জিয়া

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচন করে সবকটিতে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর প্রথম মেয়াদেই দেশ ফিরে যায় সংসদীয় গণতন্ত্রে—যা ছিল এক ঐতিহাসিক অর্জন।

১৯৯৬ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন—গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

২০০১ সালে চারদলীয় জোটের বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। এই দুই মেয়াদে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের অগ্রগতি, যমুনা সেতু নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন এবং সার্ককে গতিশীল করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

তবে একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থান, ‘বাংলা ভাই’ ইস্যু, সারাদেশে একযোগে আদালত চত্বরে হামলা এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিএনপির শাসনামল ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও ‘মাইনাস টু’ ষড়যন্ত্র

২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আবারও গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া। এ সময় বাংলাদেশে শুরু হয় তথাকথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’—খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা।

তাকে বিদেশে পাঠানোর নানা চেষ্টা করা হলেও তিনি ছিলেন অনড়। দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই।”

প্রায় এক বছর কারাবাসের পর ২০০৮ সালে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। মামলা, কারাবাস ও অসুস্থতা ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির ওপর দমন–পীড়ন শুরু হয়। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও একের পর এক মামলা দেওয়া হয়।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় নিম্ন আদালত তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে আবার বন্দী হন তিনি। পরবর্তীতে একাধিক মামলায় সাজা বাড়তে থাকে।

কারাগারে থাকা অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া হয়নি; এমনকি দেশের বেসরকারি হাসপাতালেও যেতে বাধা দেওয়া হয়।
২০২০ সালে করোনা মহামারীর মধ্যে নির্বাহী আদেশে তার দণ্ড স্থগিত করে মুক্তি দেওয়া হয়, তবে শর্ত ছিল—রাজনীতি ও বিদেশযাত্রা নিষিদ্ধ। গুলশানের বাসভবনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি কার্যত গৃহবন্দী জীবন যাপন করেন।

মুক্তি, কিন্তু ভাঙা শরীর

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আদালতে সব মামলা থেকে খালাস পান খালেদা জিয়া। আইনি দিক থেকে তিনি মুক্ত মানুষ হলেও দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতা তাঁকে শারীরিকভাবে ভেঙে দেয়। স্বাভাবিক চলাফেরার শক্তিও তখন আর তাঁর ছিল না।

সম্পর্কিত বিষয়: