ঢাকা,বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

৩১ বৈশাখ ১৪৩৩

ছাত্র সংসদ নির্বাচন : তরুণ ভোটের ইঙ্গিত ও বিএনপির সম্ভাবনা

রোকন শেখ

প্রকাশ: ০২:৩৯, ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | আপডেট: ০২:৫০, ২৭ অক্টোবর ২০২৫

ছাত্র সংসদ নির্বাচন : তরুণ ভোটের ইঙ্গিত ও বিএনপির সম্ভাবনা

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকসু, জাকসু, রাকসু ও চাকসু ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে অনেকে শুধু ছাত্রশিবিরের বিজয় হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বিষয়টি কেবল সংগঠনের জয় নয়— এর ভেতরে লুকিয়ে আছে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক মনস্তত্বিক এক গভীর পরিবর্তন। এই ফলাফল স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, তরুণ ভোটাররা এখন বাস্তবতা-ভিত্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে শিখছে। এটি একই সঙ্গে বিএনপির জন্য সতর্কবার্তা, আবার নতুন সম্ভাবনার জানালাও খুলে দিয়েছে।

কৌশলগত ভোটারের উত্থান

বাংলাদেশের জেনারেশন–জি ভোটাররা শেখ হাসিনার দীর্ঘ একদলীয় শাসনের সময় বেড়ে উঠেছে। তারা এমন এক প্রজন্ম, যারা ভোটের প্রহসন ও রাজনৈতিক দমন দেখেই বড় হয়েছে। ফলে তারা এখন তাদের প্রথম ভোটটি অর্থবহভাবে প্রয়োগ করতে চায়। আদর্শ নয়— তারা বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী শিবিরকে ভোট দিয়েছে শুধু এই কারণে যে তারা ছিল ‘জেতার মতো একমাত্র বিকল্প’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলছিলেন, ‘আমি শিবিরের সঙ্গে একমত নই, কিন্তু তারাই জিততে পারতো, তাই আমি ভোট দিয়েছি।’এই মনস্তত্ত্ব জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে কাজ করতে পারে।

একমাত্র কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিএনপি

হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংগঠন, কাঠামো ও অভিজ্ঞতা আছে একমাত্র বিএনপিরই। এনসিপি বা মধ্যপন্থী নতুন দলগুলো এখনো বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ডাকসু-জাকসুর ফলাফলই তা প্রমাণ করে দিয়েছে। তরুণ ভোটারদের চোখে এসব দল ‘অকার্যকর বিকল্প’ বা ‘ভোটের অপচয়’ হয়ে পড়ছে। ফলে রাজনীতির প্রতিযোগিতা এখন দাঁড়িয়েছে— বিএনপি বনাম সবাই, যেখানে বিএনপি সুস্পষ্টভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে।

‘সেলফ ফুলফিলিং প্রফেসি’ বা আত্মপূরণ ভবিষ্যদ্বাণী

রাজনৈতিক বিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব আছে— যে বিষয়ে মানুষ বিশ্বাস রাখে, সেটিই অনেক সময় বাস্তবে রূপ নেয়। এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৩৯ শতাংশ তরুণ ভোটার বিশ্বাস করে বিএনপি আগামী জাতীয় নির্বাচনে জিতবে। এই বিশ্বাস যত ছড়াচ্ছে, ততই কৌশলগত ভোটাররা বিএনপির দিকে ঝুঁকছে। বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এই বিশ্বাসটিকে জীবিত রাখা, কারণ বিশ্বাসই কখনও কখনও বাস্তবতা তৈরি করে।

ভোট নষ্টের ভয় ও তৃতীয় শক্তির ব্যর্থতা

তরুণ ভোটাররা এখন বুঝে গেছে— ছোট বাম বা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরোক্ষভাবে জেতানো।
ডাকসু ও রাকসুর নির্বাচনে এই মানসিকতা স্পষ্ট হয়েছে। সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থী বামপন্থী প্রার্থীদের ভোট দেয়নি, কারণ তারা চায়নি ভোট বিভক্ত হোক। জাতীয় পর্যায়েও একই মনস্তত্ত্ব কাজ করবে। ফলে অনেক তরুণ, আদর্শগতভাবে ভিন্নমত থাকলেও, বিএনপিকেই বেছে নিতে পারে কার্যকর পরিবর্তনের আশায়।

সাংগঠনিক শক্তি ও অভিজ্ঞতার পুঁজি

বিএনপির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাদের দেশব্যাপী সাংগঠনিক কাঠামো ও রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা। অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকলেও তৃণমূল পর্যন্ত তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। যখন মানুষ পরিবর্তন চায়, তখন তারা সবচেয়ে সংগঠিত ও অভিজ্ঞ বিকল্পকেই বেছে নেয়। এই অভিজ্ঞতার পুঁজি বিএনপিকে দিয়েছে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা— credible alternative হিসেবে।

শেষ কথা

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের এই ফলাফল শুধু শিবিরের উত্থান নয়, এটি তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রতীক।
তারা এখন আদর্শ নয়, বাস্তবতার রাজনীতি করছে।

এই বাস্তববাদী তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে পারলে বিএনপি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সেই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে, যেটি তারা খুঁজছে বহুদিন ধরে।

রোকন শেখ
তরুণ রাজনীতি বিশ্লেষক
উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়