ঢাকা,বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

৩১ বৈশাখ ১৪৩৩

হঠাৎ ভারত কেন তালেবানকে পাশে চায়?

ডেইলিদর্পণ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩:০২, ১৪ অক্টোবর ২০২৫

হঠাৎ ভারত কেন তালেবানকে পাশে চায়?

ছবি : সংগৃহীত

চার বছর আগেও যা অকল্পনীয় ছিল, আজ সেটাই ঘটেছে। নয়াদিল্লির লাল গালিচায় আফগান তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির পদচারণা- দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচক। যে গোষ্ঠীকে এক সময় ভারত ‘পাকিস্তানের প্রক্সি’ বলে অবজ্ঞা করত, এখন তাদেরই জন্য উষ্ণ অভ্যর্থনা, সরকারি বৈঠক, এমনকি দিল্লির দেওবন্দ সফরের অনুমোদন- কূটনৈতিক ইতিহাসে এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

২০২১ সালে মার্কিন বাহিনীর বিশৃঙ্খল প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে তালেবানদের প্রত্যাবর্তন ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে গভীর অস্বস্তিতে ফেলেছিল। কাবুলে দূতাবাস বন্ধ, নাগরিক প্রত্যাহার, এবং হঠাৎ কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা- সবকিছুই এক সঙ্কেত দিয়েছিল: ভারত এক অনিশ্চিত ভূখণ্ড থেকে আপাতত সরে এসেছে। কিন্তু সময়ই আবার পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে। পাকিস্তান-তালেবান সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান ফাটল, চীনের আফগানিস্তানে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ, এবং মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার কৌশলগত নড়াচড়া- সব মিলিয়ে ভারত বুঝেছে, কাবুলকে একা ছেড়ে দেওয়ার আর সুযোগ নেই।

এই কারণেই ভারত এখন ‘নৈতিকতা নয়, বাস্তবতা’-র রাজনীতিতে নেমেছে। তালেবান শাসনকে পছন্দ না করলেও, তাকে উপেক্ষা করে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বজায় রাখা সম্ভব নয়- এই উপলব্ধিই মোদি সরকারের নতুন কূটনৈতিক প্রণোদনা।

এদিকে তালেবান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন আগের মতো ঘনিষ্ঠ নেই। ইসলামাবাদের অভিযোগ, কাবুল এখন পাকিস্তান তালেবান (টিটিপি) সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিচ্ছে। অন্যদিকে আফগান তালেবান অভিযোগ করছে, পাকিস্তান তাদের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করছে। সীমান্তে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ, শরণার্থী বহিষ্কার, ও পারস্পরিক হামলা- এই সবই সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রমাণ।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের কাছে তালেবান এক নতুন কৌশলগত সুযোগ। শত্রুর শত্রুই মিত্র- এই পুরোনো নীতির আধুনিক সংস্করণ যেন। পাকিস্তানকে ঘিরে রাখার বা অন্তত কূটনৈতিকভাবে নিরস্ত করার এক বিকল্প পথ এখন আফগানিস্তান।

তালেবানদের প্রতিশ্রুতি- ‘ভারতের বিরুদ্ধে কোনো গোষ্ঠীকে আফগান ভূমি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না”-এই ঘোষণাও নয়াদিল্লির জন্য এক প্রতীকী বিজয়।

কাবুলে চীনের উপস্থিতি বাড়ছে দ্রুত। খনি, অবকাঠামো ও রাস্তাঘাটে বেইজিংয়ের বিনিয়োগ তালেবান প্রশাসনের অর্থনৈতিক প্রাণরস হয়ে উঠছে। ভারত যদি এই প্রেক্ষাপটে নিষ্ক্রিয় থাকে, তবে সমগ্র মধ্য এশিয়া অঞ্চলে তার প্রভাব ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়বে। ফলে নয়াদিল্লি বুঝেছে- ‘যে শত্রুর সঙ্গে কথা বলা যায় না, তার সঙ্গে ব্যবসা করা যায়’-এই ধারণাটিও কখনো কখনো রাষ্ট্রনীতির অংশ হয়ে ওঠে।

মুত্তাকির ভারত সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ও মানবিক সহায়তা পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি তাই নিছক আনুষ্ঠানিক নয়; এটি ভারতীয় ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

অবশ্য এই কূটনৈতিক উষ্ণতা অভ্যন্তরীণ বিরোধ তৈরি করেছে। নারী অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, এমনকি ভারতীয় সাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকীর হত্যার মতো প্রশ্নগুলো এখন সরকারের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নয়াদিল্লির আফগান দূতাবাসে তালেবান সংবাদ সম্মেলন থেকে নারী সাংবাদিকদের বাদ দেওয়ার ঘটনাও দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

তবে মোদি সরকারের কাছে নৈতিকতা এখন পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চালিকাশক্তি নয়। রিয়ালপলিটিক-এর এই যুগে মানবাধিকার প্রশ্নগুলো আপাতত কৌশলগত সুবিধার আড়ালে চাপা পড়ছে।

ভারতের দরজা খুলে যাওয়া তালেবান প্রশাসনের জন্য এক বিরাট কূটনৈতিক অর্জন। তারা এখনো জাতিসংঘ বা পশ্চিমা বিশ্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র যখন তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্তরে বৈঠকে বসে, তখন তা তাদের জন্য এক ‘ডি ফ্যাক্টো’ বৈধতার সিলমোহর। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আফগান অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও পণ্যবাণিজ্যের ওপর ভারতীয় সহায়তা আফগান জনগণের বাস্তব জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ভারত-তালেবান সম্পর্ক এখনো পারস্পরিক সন্দেহে ভরা, তবু উভয়েই জানে- এটাই প্রয়োজন। ভারত চায় পাকিস্তানের প্রভাব ঠেকাতে ও মধ্য এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান রক্ষা করতে, আর তালেবান চায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সহায়তা।

এই সম্পর্ক তাই কোনো আদর্শের নয়, বরং প্রয়োজনের মৈত্রী। তবু এই প্রয়োজনই ভবিষ্যতে এক নতুন দক্ষিণ এশীয় বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে- যেখানে ধর্মীয় মতাদর্শ নয়, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থই প্রধান চালিকা শক্তি হবে।