ঢাকা,মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

২৩ আষাঢ় ১৪৩৩

বাবা: এক অব্যক্ত অনুভূতির নাম

সাইয়্যেদা গালিবা রুহী

প্রকাশ: ২১:০৩, ২২ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২১:২৮, ২২ জুন ২০২৬

বাবা: এক অব্যক্ত অনুভূতির নাম

ছবি: ডেইলি দর্পণ

‘বাবা’ আমাদের জীবনের এক অপ্রকাশিত ভালোবাসা, যাকে কখনো মুখ ফুটে বলা হয় না—‘বাবা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ কিন্তু প্রতিটি কাজে, সিদ্ধান্তে এক অদৃশ্য নিবিড় ছায়ার মতো আমাদের ঘিরে রাখেন তিনি। তার ত্যাগ, পরিশ্রম আর নিঃশব্দ স্নেহেই গড়ে ওঠে আমাদের স্বপ্নের ভিত্তি। বাবা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের বাবাকে ঘিরে নিজেদের অনুভূতি ও ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছেন।

বাবার প্রতি অনুভূতি ব্যক্ত করতে কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মনন রহমান বলেন, ছোটবেলায় বিকেলে নিয়মিত বাবার সাথে মাঠে যেতাম। মাঠে সবাইকে ক্রিকেট খেলতে দেখতাম। ধীরে ধীরে আমারও একটি ব্যাট হলো, আর বাবা আমাকে ব্যাট ধরা, বল করা—সবই শিখিয়েছেন। সাইকেলের প্রথম প্যাডেল দেওয়ার সময় যে হাতটি সাইকেলটি ধরে রেখেছিল, সেটিও ছিল বাবার। কলম ধরিয়ে ‘অ, আ, ক, খ’ কিংবা ‘A, B, C’ যিনি শিখিয়েছেন, তিনিও সেই একই মানুষ।

ধীরে ধীরে যেমন পরম বিশ্বাসে বাবা সাইকেলটি ছেড়ে দিয়ে আমাকে এগিয়ে যেতে শিখিয়েছেন, তেমনি আমিও অজান্তেই দ্রুত বড় হয়ে গেছি। বাবার কাঁধে চড়ে ঘুরতে যাওয়া, গ্রামে গিয়ে মাছ ধরা—এমন রঙিন মুহূর্তগুলো যেন হাওয়াই মিঠাইয়ের মতোই ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু সেই মিষ্টি স্মৃতিগুলোই আজ আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।

‘বাবা’ শব্দটি ছোট হলেও, আমার কাছে তাঁর অবস্থান দিনের আকাশের সূর্যের মতো, যার আলো আমার যাপিত জীবনকে আলোকিত করে। বাবার দেওয়া জীবনের শিক্ষাকেই পাথেয় করে যেন আমি নিজের এবং আশেপাশের মানুষের জীবন আলোকিত করতে পারি—এই প্রার্থনা করি প্রতিদিন।

আমার কাছে আমার বাবা ছোটবেলার নায়ক; যেমন সবার জীবনেই প্রথম নায়ক তার বাবা। তাই আজ বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবাকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। মহান আল্লাহ তাআলা যেন আমার বাবাকে সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু দান করেন—এই দোয়া করি।

কৃষি অনুষদের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. ফাহাদ এনাম বলেন, আমার জীবনে ‘বাবা’ মানেই এক অপরাজিত যোদ্ধার নাম। যিনি তার প্রতি ফোঁটা ঘাম আর অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে আমাদের আগলে রেখেছেন, গড়ে তুলেছেন আমাদের ভবিষ্যতের মজবুত ভিত্তি।

শৈশবে আঙুল ধরে স্কুলে যাওয়ার দিনগুলো থেকে শুরু করে আজ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়েও—জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাবার উপস্থিতি আমি গভীরভাবে অনুভব করি। খুব ছোটবেলায় যখন ইংরেজি গ্রামারের কঠিন নিয়মগুলো মুখস্থ করতে বলতেন, তখন কেন জানি এক অদ্ভুত অভিমান এসে ভিড় করত মনে। মনে হতো, বাবা কেন এত কঠোর? কিন্তু আজ জীবনের এই পর্যায়ে এসে বুঝতে পারি, বাবার সেই শাসনগুলো আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী ছিল। আজ আমি যা কিছু, তার সবকিছুর পেছনে রয়েছে বাবার সেই নীরব অবদান।

এই বিশেষ দিনে বাবাকে নিয়ে অনেক কিছু লিখতে গেলেও স্মৃতির বেড়াজালে কলম আটকে যায়, ভাষা হারিয়ে ফেলে তার গন্তব্য। শব্দের ফ্রেমে বাবাকে বন্দী করা অসম্ভব। পরিশেষে, সবার কাছে একটাই অনুরোধ—আমি যেন বাবার দেখা প্রতিটি স্বপ্ন পূরণ করতে পারি এবং তাঁর মুখ উজ্জ্বল করতে পারি; আমার জন্য এতটুকুই দোয়া করবেন। জগতের সকল বাবা ভালো থাকুন।

ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্টের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোছা. ফাতিমা তুজ জোহরা বলেন, বাবা শুধু দুইটি অক্ষরের একটি শব্দ নয়, যেখানে মিলন ঘটে একজন সন্তানের আবেগ, ভালোবাসা, ভয়, অভিমান—সবকিছুর। একজন সৈনিক যেমন তার জীবন দিয়ে দেশকে রক্ষা করেন, তেমনই বাবাও তার জীবন দিয়ে আমাদের আগলে রাখেন। আমাদের গলার স্বর শুনলেই যিনি অর্ধেক কথা বুঝে যান—আমাদের আনন্দ, খুশি বা দুঃখ-কষ্ট। আমরা যখন কোনো দুশ্চিন্তায় পড়ি, তিনি আমাদের থেকে হাজার মাইল দূরে থাকলেও কিভাবে যেন বুঝে যান, তাই না?

আর যখন তিনি বলেন, ‘এত চিন্তা কিসের বাবা? আমি তো আছি’—তিনি কী সুন্দরভাবে আমাদের চিন্তাগুলো নিজের করে নেন। বাবাদের কি অদ্ভুত ক্ষমতা সবকিছু ঠিক করে দেওয়ার! বাবা এমন একজন মানুষ, যিনি তার মন খারাপ কখনো কারো সামনে প্রকাশ করেন না। নিজেকে সবার সামনে না প্রকাশ করার এক অদৃশ্য দেয়াল যেন তাকে আটকে রাখে। আর আমরাও ভেবে নিই, বাবারা মনে হয় এমনই হন—তাদের কোনো খারাপ লাগা নেই।

আমাদের বাবারা কখনো মুখ ফুটে বলতে পারেন না, ‘বাবা, আমি তোকে এতটা ভালোবাসি।” সন্তানের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা অপ্রকাশিতই থেকে যায়। আর আমরা সন্তানরাও মাকে যত সহজে বলতে পারি, বাবাকে ততটা পারি না। বাবা-সন্তানের মাঝে এই কথাটি না বলাই থেকে যায়, আর হয়তো জীবনে বলাও হয়ে ওঠে না—“আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবা।’

কৃষি অনুষদের ৪র্থ বর্ষের অপর এক শিক্ষার্থী বুশরা বিনতে হাসান এভাবে তার অনুভূতি ব্যাক্ত করেছেন, মনে আছে সেই ছোট্ট বুশরা—যাকে কোলের মধ্যে জড়িয়ে রাখতে। কখনো বুঝতে দাওনি, ছুঁতে দাওনি দুনিয়াবি কোনো কিছু। সেই মেয়ে আজ কত দূরে থাকে তোমার থেকে। তোমাকে যে এতটা ভালোবাসি, সেটা বুঝলাম ময়মনসিংহ চলে আসার পরে। এই একলা শহরে আসার পরে বুঝলাম বাবা আমার জীবনে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ!

এই ঘুমপ্রিয় বুশরার বাবা-ই একমাত্র খেয়াল রাখে মেয়ের যেন ঘুম না ভাঙে। ঘুরাঘুরি প্রিয় বুশরাকে বলতে হয় না, “বাবা আমি কি এখানে যাব?” তার আগেই টাকা পাঠিয়ে দেয়। খুব বেশি মন খারাপ থাকলে কল দেই বাবাকে—দুনিয়ার গল্প জুড়ে দেয়। এই যে সেমিস্টারের রেজাল্ট দেয়, কোনোদিন আমাকে প্রশ্ন করে না, “কি করেছো?” কল দিয়ে শুধু বলে, “কি লাগবে?”

আমার এতো কিছু কার জন্য? মেয়ের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাও উপহার দিতে বাবা দুইবার ভাবেনি। সবসময় মেয়ের জন্য সেরা দিয়েছে। এই ভালোবাসার প্রতিদান কোনোদিনই দেওয়া সম্ভব হবে না। তবুও যদি জীবনে কিছু ভালো করতে পারি, সবটাই আমার বাবা-মায়ের জন্য। বুশরাকে এতটা ভরসা করার জন্য, এতটা আগলে রাখার জন্য অনেক ধন্যবাদ বাবা। তোমার রাগ যেমন পেয়েছি, তোমার মতো ভালো মনটাও যেন আমি পাই।
ভালোবাসি বাবা!

মাৎসবিজ্ঞান অনুষদের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া করিম জিসা বাবাকে নিয়ে বলেন, বাবা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তিনি আমাদের পরিবারের প্রধান অভিভাবক ও ভরসার স্থান। ছোটবেলা থেকে তিনি আমাকে ভালোবাসা, স্নেহ ও সঠিক পথের দিকনির্দেশনা দিয়ে বড় করে তুলেছেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি আমাকে উৎসাহ ও সাহস জুগিয়েছেন।

আমার বাবা অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ। পরিবারের সুখ-শান্তি ও আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য তিনি নিরলস পরিশ্রম করেন। নিজের কষ্টের কথা কখনো প্রকাশ না করে সবসময় আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। তাঁর ত্যাগ ও ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না।

বাবার কাছ থেকে আমি সততা, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা এবং মানুষের প্রতি সম্মান দেখানোর শিক্ষা পেয়েছি। তিনি সবসময় আমাকে ভালো মানুষ হওয়ার পরামর্শ দেন। কোনো সমস্যায় পড়লে তিনি আমার পাশে দাঁড়ান এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেন।

আমার জীবনে বাবার অবদান অপরিসীম। তিনি আমার প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। আমি আমার বাবাকে অনেক ভালোবাসি এবং তাঁর স্বপ্ন পূরণের জন্য সর্বদা চেষ্টা করব। মহান আল্লাহর কাছে আমার প্রার্থনা, তিনি যেন আমার বাবাকে সুস্থ, সুখী ও দীর্ঘায়ু দান করেন। সাথে জগতের সকল বাবাকে ভালো রাখুন।

এ সম্পর্কিত খবর